Dhaka Sentinel-Bangla

অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ঢাকা ট্রিবিউনের ৩ সাংবাদিককে নির্যাতন করেছে মাদক কারবারিরা

গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদক কারবারের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনের তিন সাংবাদিককে তিন ঘণ্টা জিম্মি করে অস্ত্রের মুখে নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ও বানোয়াট ভিডিও ধারণ করে চলে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ঠিক একই এলাকায় আরেক সাংবাদিক অপহৃত ও নির্যাতিত হওয়ার পর এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠলো ওই অঞ্চলে অপরাধী চক্রের ভয়াল প্রভাব। শুক্রবার টঙ্গী পশ্চিম থানার অন্তর্গত হাজির মাজার বস্তিতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। তথ্য সংগ্রহ করতে সেখানে গিয়েছিলেন ঢাকা ট্রিবিউনের দুই প্রতিবেদক রবিউল হাসান ও আসিফুল ইসলাম রিফাত এবং আলোকচিত্র সাংবাদিক আবির আহমেদ সুপ্ত। শুক্রবার সন্ধ্যায় টঙ্গী পশ্চিম থানায় রবিউল হাসানের দেওয়া লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, তথ্য সংগ্রহের সময় ২০ থেকে ২৫ জনের একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা মাথার ওপর পিস্তল উঁচিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে অঙ্গচ্ছেদের হুমকি দেয় এবং পাশের একটি স্থানে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। সেখানে তিন ঘণ্টা ধরে তাদের আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে ঘুমের ওষুধ মেশানো তরল পান করতে বাধ্য করা হয়। এরপর সামনে টাকা ও মাদক রেখে ভিডিও ধারণ করে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে দুর্বৃত্তরা, যেন পরবর্তীতে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য তাদের ব্ল্যাকমেইল করা যায়। ‘আমাদের মেরে ফেলার পরিকল্পনা ছিল’  ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে রবিউল জানান, মাদক চালানের নানা তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে তারা এলাকাটিতে প্রায় দেড় ঘণ্টা কাটান। তিনি বলেন, ‘আমার ফোনে স্পষ্ট ছবি ও ভিডিও ছিল। এর মধ্যে মাদক কারবারি ও তাদের বিভিন্ন কেনাবেচার কেন্দ্রগুলোর সুস্পষ্ট ফুটেজও রয়েছে।’ রবিউলের অভিযোগ, সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরদারি চালিয়ে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে দুর্বৃত্তরা এবং তার ফোনের অ্যাকসেস দাবি করে। তিনি বলেন, ‘আমি দিতে অস্বীকার করলে হামলা চালায়, বন্দুক ঠেকিয়ে ফোন ছিনিয়ে নেয় এবং সব তথ্য মুছে ফেলে।’ রবিউল আরও জানান, দুর্বৃত্তরা তাদের রিভলবার দিয়ে বারবার আঘাত করে ও গুলি করার হুমকি দেয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের সংগৃহীত তথ্য দেখে ফেলার পর তারা আমাদের সন্ধ্যা পর্যন্ত জিম্মি করে রাখে এবং মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে। রিভলবার দিয়ে পেটানোর পাশাপাশি গুলি করারও চেষ্টা করে।’ তিনি আরও জানান, তাদের জিম্মি করে রাখার সময় আশপাশে অন্তত ২০০ জন লোক প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা করছিল। স্থানটি একটি মসজিদ থেকে মাত্র ২০ মিটার এবং ফেরিঘাট থেকে ৫০ মিটার দূরে অবস্থিত হলেও ওই দীর্ঘ সময়ে কোনও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য সেখানে পৌঁছাননি। অবশেষে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ভিডিও কল করে ওই এলাকায় মাদক কারবার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ বন্ধের শর্তে তাদের ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। জীবনের ভয়ে সাংবাদিকরা রাজি হলে দুর্বৃত্তরা ফের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়। আহত সাংবাদিকদের প্রথমে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। একই এলাকায় আরেক সাংবাদিক নির্যাতন এর আগে গত ২৬ অক্টোবর একই এলাকায় দৈনিক কালবেলা’র গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি মহিন উদ্দিন রিপন অস্ত্রধারীদের হাতে অপহৃত হন। তাকে মারধর ও নির্যাতন করে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ভয় দেখাতে ও ব্ল্যাকমেইল করতে কাপড় খুলে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ফুটেজ ধারণ করা হয়। শুক্রবারের হামলার সময়ও ঢাকা ট্রিবিউনের সাংবাদিকদের রিপনের ওপর নির্যাতনের সেই সব ছবি ও ভিডিও দেখায় দুর্বৃত্তরা। একই কৌশলের পুনরাবৃত্তিতে টঙ্গীতে সংগঠিত অপরাধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে। এর পাশাপাশি মাজার বস্তি এলাকা থেকে বিমানবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বাইক উদ্ধার এবং তুরাগ নদী থেকে তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগের মাত্রা আরও বেড়েছে। তবে ওই মৃত্যুর সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলার কোনও সম্পর্ক এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ‘পুলিশও সেখানে যেতে ভয় পায়’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা ওই এলাকায় কাজ করার চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এমনকি আমরা পুলিশ সদস্যরাও সেখানে যেতে ভয় পাই। মনে হয় এটি বাংলাদেশের ভেতরের আলাদা এক রাষ্ট্র। আমরা দল বেঁধে গেলেও কোনও কাজ করতে পারি না। একবার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সহকর্মীকে নিয়ে আমি প্রায় প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছিলাম।’ তিনি সাংবাদিকদের ওই বস্তির অপরাধ অনুসন্ধানে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। অভিযানের আশ্বাস পুলিশের গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার (শনিবার যার দায়িত্বের শেষ দিন ছিল) ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টঙ্গী মাজার বস্তি ও আশপাশের এলাকায় সন্দেহভাজন মাদক কারবারি ও অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত অভিযান চালানো হবে।নতুন দায়িত্ব নেওয়া জিএমপি কমিশনার মো. আশিক সাঈদ জানান, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা নেবেন। টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান জানান, লিখিত অভিযোগটি তদন্তের জন্য এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, গত দুই দিনে এলাকাটি থেকে ছয়জন মাদকসেবী ও দুজন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাজার বস্তিতে উচ্ছেদ অভিযানের পর কারবারিরা কৌশল বদলে তুরাগ নদী ও ইজতেমা ময়দানের আশপাশে মোবাইল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। অভিযানে গেলে আসামিরা ডিএমপি এলাকায় বা ইজতেমা ময়দানে পালিয়ে যায়। বড় পরিসরে যৌথ অভিযান চালানো নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ঢাকা ট্রিবিউনের ৩ সাংবাদিককে নির্যাতন করেছে মাদক কারবারিরা