চীন ও ইউরোপের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। একসময় দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক এই বাণিজ্য এখন প্রতিযোগিতা, বাজার দখলের লড়াই এবং পারস্পরিক অসন্তোষে রূপ নিয়েছে। চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন, ইউরোপের বাজারে পণ্যের প্রবেশ এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সংকুচিত হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে চীনের বিকল্প বাজারের প্রয়োজন বেড়ে যাওয়ায় বেইজিংয়ের ওপর কিছুটা চাপ তৈরির সুযোগ পেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ চীনের ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ কর্মসূচি। এর আওতায় উৎপাদনশিল্পের আধুনিকায়ন ও উচ্চ মূল্য সংযোজনের লক্ষ্যে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি পণ্য বিক্রির জন্য বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। একসময় চীনের বাজারে ইউরোপীয় বিলাসপণ্য ও উন্নত যন্ত্রপাতির ব্যাপক চাহিদা ছিল। বিশেষ করে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায় ছিল উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। ২০০৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি বছরে গড়ে ২৪ শতাংশ, বিএমডব্লিউর ২০ দশমিক ২ শতাংশ এবং অডির ১২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনা প্রতিযোগীদের উত্থানে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত আগের ১২ মাসে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি কমেছে ৩০ শতাংশ। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ১২ মাসে বিএমডব্লিউর বিক্রি কমেছে ২৫ শতাংশ। আর প্রথম প্রান্তিকে অডির বিক্রি কমেছে ১২ শতাংশ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে চীনা পণ্যের জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে পণ্য পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে বেইজিংয়ের। ২০২৫ সালে চীন থেকে ইইউর পণ্য আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১২ মাসেও আমদানি বেড়েছে ৮ শতাংশ। এতে চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যঘাটতি ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের ৬৬ বিলিয়ন ইউরো থেকে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেড়ে ১০৩ বিলিয়ন ইউরোয় দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ইউরোপের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মহলে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ সতর্ক করে বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি মধ্যম প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশিল্পকে দুর্বল করে দিতে পারে। ফ্রান্সের একটি সরকারি প্রতিবেদনে চীনা আমদানিকে ইউরোপের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জার্মানিও এ বিষয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে একই অবস্থানে এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিই ইউরোপের জন্য নতুন দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি করেছে। চলতি বছর চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় বেইজিং ইউরোপে প্লাগ-ইন ও হাইব্রিড গাড়ি রফতানি বছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজারে সীমিত রাখতে এবং পরবর্তী সময়ে বছরে ৬ শতাংশ হারে বাড়াতে সম্মত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া রাসায়নিক পণ্য আমদানিতেও একই ধরনের সীমা আরোপের আলোচনা চলছে। চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগও নিচ্ছে ইইউ। প্যারিসভিত্তিক জ্যাক দেলর ইনস্টিটিউটের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এলভির ফ্যাব্রির মতে, ইউরোপের সামনে সুযোগের সময়সীমা খুবই সংক্ষিপ্ত। তাই সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে ইউরোপীয় দেশগুলো। সূত্র: ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।