Dhaka Sentinel-Bangla

নিলামে ঝড়ে পড়া গাছ কাটার আড়ালে অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কাটার অভিযোগ

বরগুনার তালতলীতে টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নিলামে বিক্রি হওয়া ঝড়ে পড়া গাছের আড়ালে অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলামের যোগসাজশে নিলামের শর্ত ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রভাব খাটিয়ে এসব গাছ কেটে নিয়েছেন ওই ব্যক্তি। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের অধীন আমতলী রেঞ্জ (তালতলী) কেন্দ্রের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের লট নম্বর ০৫ ও ০৬-এর আওতায় বনজ সম্পদ উত্তোলনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১ জুলাই উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। দরপত্র বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, লটের মূল্য ৫৯ হাজার ৪৭০ টাকা, ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ৮ হাজার ৯২১ টাকা এবং ১০ শতাংশ আয়কর বাবদ ৫ হাজার ৯৪৭ টাকাসহ মোট ৭৪ হাজার ৩৮৮ টাকা রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে পরিশোধের পর ক্রেতা মো. সোহেল রানাকে লট ক্রয়ের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের চর রতনের পূর্ব পাশের বাগান এলাকায় অবস্থিত ৫ নম্বর লটে ২৫টি গাছ (চিহ্নিত ক্রমিক নম্বর ০১-২৫) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব গাছে মোট ৭৮ দশমিক ৩৫ ঘনফুট কাঠ ও ৪৮ ঘনফুট জ্বালানি রয়েছে। একই এলাকার ৬ নম্বর লটে আরও ২৫টি গাছ (চিহ্নিত ক্রমিক নম্বর ২৬-৫০) রয়েছে। এতে রয়েছে ৭০ দশমিক ১৯ ঘনফুট কাঠ ও ৪২ ঘনফুট জ্বালানি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কার্যাদেশ অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত গাছ কাটার মেয়াদ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু কার্যাদেশের শর্ত অমান্য করে ১০ অক্টোবর নিলামকৃত গাছ কেটে নিয়ে যান ক্রেতা সোহেল রানা। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি গাছ কাটা সম্ভব হয়নি জানিয়ে অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্র উত্তাল থাকার কারণ দেখিয়ে ১২ অক্টোবর সময় বাড়ানোর আবেদন করেন তিনি। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ অক্টোবর উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। গত ৬ নভেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতাধীন নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের চর রওশনের পূর্ব পাশের বাগান এলাকায় বন বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই নিলামকৃত ঝড়ে পড়া গাছের আড়ালে জীবিত গাছ কেটে ট্রলারে করে নিয়ে যাচ্ছেন ক্রেতা সোহেল রানা। এ সময় নিলামকৃত ঝড়ে পড়া গাছে বন বিভাগের নির্দিষ্ট চিহ্ন থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ গাছে কোনো চিহ্ন বা সিল দেখা যায়নি। আবার বিভিন্ন গাছে একই ক্রমিক নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করার অনিয়মও দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মবহির্ভূতভাবে বনের মূল্যবান আকাশমণি, ঝাউ ও বাবলাগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবিত গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে। পরে গাছ কাটার আলামত নষ্ট করতে কয়েকটি গাছের গোড়ায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতেও দেখা যায়। খবর পেয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে একাধিক জীবিত গাছ কাটা অবস্থায় দেখলেও মাত্র একটি গাছের চারটি খণ্ড জব্দ করেন। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ‘রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম নিলাম ক্রয়কারী ব্যক্তির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বনের জীবিত গাছ কাটার সুযোগ করে দিয়েছেন। এমনকি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসেও তিনি রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেননি।’ অভিযোগের বিষয়ে নিলামে গাছ ক্রয়কারী সোহেল রানা বলেন, ‘নিলামের মাধ্যমে আমরা কেবল ঝড়ে পড়ে যাওয়া গাছগুলোই কেটেছি। এর বাইরে কোনো জীবিত গাছ কাটা হয়নি। আগুন লাগানোর ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কে বা কারা আগুন দিয়েছে, সে বিষয়েও আমাদের কিছু জানা নেই।’ নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত বিট কর্মকর্তা জহিরুল হক বলেন, ‘আগের বিট কর্মকর্তা চলে যাওয়ার পর আমি কিছুদিন আগে দায়িত্ব নিয়েছি।’ একই ক্রমিক নম্বর একাধিক গাছে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যিনি গাছগুলো চিহ্নিত করেছেন, এটি তাঁর ভুল ছিল।’ তবে বর্তমানে ঠিক কতটি গাছ কাটা হয়েছে এবং কতটি গাছ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান। অভিযোগ অস্বীকার করে বন বিভাগের আমতলী রেঞ্জ (তালতলী) কেন্দ্রের রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের আগেই এই গাছের নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তাই এখান থেকে আমার কোনো সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ তবে জীবিত গাছ কাটা ও বনে আগুন দেওয়ার ঘটনা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে আকাশমণি গাছের চারটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি, বনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’ এ বিষয়ে বন বিভাগের বরগুনা কার্যালয়ের সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন ভূঞা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নলবুনিয়া ক্যাম্পে অনুমোদিত দুটি লটের আওতায় মোট ৫০টি গাছ আহরণের কার্যক্রম চলছিল। এর ধারাবাহিকতায় নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত একটি আকাশমণি গাছ অবৈধভাবে কর্তনের বিষয়টি ধরা পড়েছে। এছাড়া অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কাটার বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিলামে ঝড়ে পড়া গাছ কাটার আড়ালে অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কাটার অভিযোগ