প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
ডেস্ক নিউজ ||
দেশ অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের এমন সব নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, যা দেখে প্রথাগত চোর-ছিনতাইকারীরাও পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারেন। আগে আয় করতে হলে মানুষের পকেটে হাত দিতে হতো, দোকানে হানা দিতে হতো, কিংবা রাস্তায় ভয় দেখাতে হতো। এখন আর এত ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কি? কয়েক জন লোক জোগাড় করুন, এক জনকে চাঁদাবাজ সাজান, আরেক জনকে নিরীহ দোকানদার, তৃতীয় জনকে জনদরদি প্রতিবাদী। তারপর দোকানদারের গালে একটি চড়, চাঁদাবাজের গালে ১১টি চড়, সঙ্গে কয়েকটি সংলাপ, কিছু উত্তেজনা আর ক্যামেরার সামনে জনতার ভিড়। ব্যস, সমাজ সংস্কারের মহৎ উদ্যোগ সম্পন্ন। এবার ভিডিওটি ফেসবুকে ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ুন। জনগণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করবেন, কেউ প্রতিবাদীর প্রশংসা করবেন, কেউ আরো বেশি মারধরের দাবি জানাবেন। আর আপনি ঘরে বসে ভিউ গুনবেন, আয় গুনবেন। দেশও সেবা পেল, ব্যবসাও হলো। এমন বহুমুখী প্রতিভার কদর না করে উপায় কি।
কাওরান বাজারে চাঁদাবাজি ও থাপ্পড় মারার একটি ঘটনা সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ঘটনাটি এই নবজাগরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। টিয়া রঙের কোটি পরা এক যুবক সবজি বিক্রেতার কাছে চাঁদা চাইছেন, টাকা না দিলে দোকান উঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, তারপর গালে থাপ্পড় বসাচ্ছেন। জনতার বিবেক জাগ্রত করার মতো এর চেয়ে উপযুক্ত দৃশ্য আর কী হতে পারে! অতঃপর হাফহাতা শার্ট পরা এক সাহসী যুবকের আবির্ভাব। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন, চাঁদাবাজের কাছে কৈফিয়ত চান, তারপর পরপর ১১টি থাপ্পড় দিয়ে ন্যায়বিচারের একাদশ অধ্যায় রচনা করেন। দর্শকও মুগ্ধ। কেউ লিখেছেন, 'মাইর কম হয়েছে।' অর্থাৎ দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে রাখতে যাদের ধৈর্য ফুরিয়ে এসেছে, তারা অন্তত ফেসবুকের বিচারালয়ে একটু সান্ত্বনা পেয়েছেন। পরে জানা গেল, চাঁদাবাজও আসল নন, প্রতিবাদীও আসল নন, ঘটনাটিও আসল নয়। আসল শুধু দর্শকের রাগ, আর সেই রাগ বিক্রি করে যারা টাকা কামাচ্ছেন, তাদের ব্যবসা
এখন প্রশ্ন, অভিনয় করে আয় করা কি অপরাধ? নিশ্চয়ই নয়। সিনেমায় ডাকাত সেজে কেউ অপরাধী হন না, নাটকে চোরের চরিত্রে অভিনয় করলেই কাউকে জেলে যেতে হয় না। কিন্তু সিনেমার টিকিট কেটে দর্শক জানেন, তিনি অভিনয় দেখছেন। এখানে অভিনয়কে বাস্তবের পোশাক পরিয়ে দর্শকের সামনে হাজির করা হচ্ছে। একে যদি সচেতনতা বলা হয়, তাহলে প্রতারককে নাট্যকার আর প্রতারণাকে জনসেবামূলক প্রকল্প বলতেও আপত্তি থাকার কথা নয়। ব্যবসার কৌশলটিও চমৎকার। সাধারণ ভিডিওতে মানুষ আগ্রহী হন না, তাই প্রথমেই একটা থাপ্পড় দরকার। গল্পের ভূমিকা নেই, চরিত্রের বিকাশ নেই, যুক্তির ধারাবাহিকতা নেই। সরাসরি গালে আঘাত, তারপর দর্শকের মস্তিষ্কে আঘাত। মানুষ থমকে যায়, ভিডিও দেখে, উত্তেজিত হয়। কেউ জানতে চান, এরপর কী হলো: কেউ প্রতিবাদীর পক্ষ নেন; কেউ চাঁদাবাজের আরো শাস্তি চান। এই যে মানুষের আবেগের ওপর একের পর এক চড় বসিয়ে মনোযোগ আদায় করা, সেটিই এখন ডিজিটাল অর্থনীতির এক কার্যকর বিপণন কৌশল। আগে বিজ্ঞাপনদাতারা পণ্য বিক্রি করতেন, এখন কনটেন্ট নির্মাতারা মানুষের ক্ষোভ, ঘৃণা, প্রতিশোধ স্পৃহা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে পণ্যে পরিণত করছেন পার্থক্য শুধু এই যে, আগের ব্যবসায় পণ্যটি চোখে দেখা যেত, এখন পণ্যটি মানুষের মনের ভেতরে তৈরি হয়।
এই শিল্পের সবচেয়ে সুবিধাজনক দিক হলো, এখানে কাউকে সত্যিকার অর্থে অন্যায়ের শিকার হতে হয় না: অন্যায়ের শিকার হওয়ার অভিনয় করলেই চলে। কাউকে সত্যিকার অর্থে প্রতিবাদ করতে হয় না; প্রতিবাদের পোশাক পরে কয়েকটি চড় মারলেই হয়। আর সমাজকে বদলানোর জন্য যে সময়, শ্রম, সংগঠন, আইনি লড়াই ও দায়িত্ববোধ দরকার, তার কোনোটিই বিশেষ প্রয়োজন হয় না। একটি ভিডিও বানান, ক্যাপশনে লিখুন 'সমাজের অসংগতি রুখে দাঁড়ান', তারপর মনিটাইজেশনের টাকা হাতে নিয়ে সমাজ পরিবর্তনের পরবর্তী পর্বের পরিকল্পনা করুন। চাইলে পরের ভিডিওতে ছিনতাইকারী ধরুন, তার পরেরটিতে দুর্নীতিবাজ পেটান, তারপর পরিবেশদূষণকারীর গালে চড় বসান বাস্তবে সমস্যাগুলো থেকে যাবে, কিন্তু সমস্যার বিরুদ্ধে আপনার কনটেন্টের ঘাটতি হবে না। এ যেন এমন এক উন্নয়ন মডেল, যেখানে রোগ সারানোর চেয়ে রোগীর যন্ত্রণার দৃশ্য ধারণ করাই বেশি লাভজনক।
প্রান্তিক মানুষকে নিয়েও এই ব্যবসার কুশলতা কম নয়। কখনো রিকশাচালক, কখনো দোকানদার, কখনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ-কাউকে না কাউকে সামনে দাঁড় করিয়ে একটি উত্তেজক দৃশ্য তৈরি করতে হবে। তারপর তার গায়ে অপমানের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে, আর সেই অপমানকে বলা হবে সামাজিক সচেতনতা। বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষকে হেয় করে ভিডিও বানিয়ে ক্যাপশনে তাদের বিরুদ্ধে সাধারণীকরণমূলক অভিযোগ লিখে দিলেই দর্শকের একাংশের ক্ষোভ প্রস্তুত। কে প্রকৃত অন্যায় করেছেন, অভিযোগের ভিত্তি কী, দৃশ্যটি আদৌ বাস্তব কি না-এসব প্রশ্ন পরে দেখা যাবে। আগে মানুষের আবেগকে উত্তপ্ত করতে হবে। কারণ, যুক্তি দিয়ে দর্শককে আটকে রাখা কঠিন; বিদ্বেষ দিয়ে আটকে রাখা তুলনামূলক সহজ। আর বিদ্বেষের বাজারে সত্যের চেয়ে উত্তেজনার দাম বেশি।
এদিকে দর্শকেরাও একেক জন ভার্চুয়াল বিচারপতি। ভিডিওর নিচে বসেই তারা অপরাধ নির্ধারণ করেন, শাস্তির মেয়াদ ঠিক করেন, থাপ্পড়ের সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করেন। কেউ জানতে চান না, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগটি সত্য কি না, ভিডিওটি সাজানো কি না, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই দৃশ্যের পরিণতি কী হতে পারে। তাদের কাছে বিচার মানে অপরাধীর গালে শব্দ হওয়া, আর ন্যায়বিচার মানে সেই শব্দের সঙ্গে নিজের ক্ষোভের মিল খুঁজে পাওয়া। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে তাদের ক্ষোভের কারণ থাকতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষোভকে অভিনীত প্রতিশোধের দৃশ্য দিয়ে শান্ত করা আর বাস্তবের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। ফেসবুকের আদালতে রায় দিতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড; বাস্তবের আদালতে প্রমাণ লাগে। তাই প্রথমটির দর্শক বেশি, দ্বিতীয়টির দায়িত্ব বেশি।
এই ব্যবসার একমাত্র নায়ক নির্মাতারা নন। তাদের পাশে আছে এমন একটি প্ল্যাটফরম-অর্থনীতি, যেখানে মানুষের মনোযোগই মূলধন। যে ভিডিও যত বেশি দেখা হয়, যত বেশি প্রতিক্রিয়া পায়, যত বেশি ছড়িয়ে পড়ে, সেটি তত বেশি মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। ফলে সত্য, মিথ্যা, অভিনয়, অপমান-সবকিছুর মধ্যে প্রতিযোগিতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় মানুষের মনোযোগ কে কতক্ষণ ধরে রাখতে পারল। প্ল্যাটফরমের কাছে এই মনোযোগ ব্যবসার সম্পদ, নির্মাতার কাছে আয়ের সুযোগ, আর দর্শকের কাছে বিনোদন কিংবা প্রতিবাদের অভিজ্ঞতা। মধ্যখানে সত্যের অবস্থানটি বেশ করুণ। সে যতই বলুক, 'একটু যাচাই করে দেখুন', দখুন', দর্শক ততক্ষণে ১১টি থাপ্পড় দেখে ফেলেছেন এবং মন্তব্যের ঘরে দ্বাদশটির দাবি জানিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য প্ল্যাটফরমের ব্যাবসায়িক প্রণোদনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অর্থ এই নয় যে, নির্মাতাদের দায় মুছে যায়। বরং দুপক্ষের দায়িত্বই আলাদা করে দেখতে হবে।
দেশের আয়-ইনকামের নতুন নতুন পথ আবিষ্কারের ইতিহাসে তাই এই শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। একসময় মানুষ অন্যায় করে টাকা কামাতেন, এখন অন্যায়ের অভিনয় করে টাকা কামানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে। আগে চাঁদাবাজি ছিল বাস্তব সমস্যা, এখন চাঁদাবাজির অভিনয়ও লাভজনক কনটেন্ট। আগে প্রতিবাদ ছিল সামাজিক দায়িত্ব, এখন প্রতিবাদীর চরিত্রে অভিনয় করাও পেশাগত দক্ষতা। আগে মানুষ অন্যায়ের শিকার হলে বিচার চাইতেন, এখন অন্যায়ের একটি সাজানো দৃশ্য দেখেই অনেকে বিচার শেষ করে ফেলেন। আর নির্মাতারা এই নতুন বাস্তবতায় এমন এক ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে সমাজের সমস্যার সমাধান হওয়া জরুরি নয়; সমস্যার একটি আকর্ষণীয় দৃশ্য তৈরি হলেই যথেষ্ট।
সুতরাং, উন্নয়নের এই ধারাকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। চুরি-ছিনতাইয়ের ঝুঁকি না নিয়েও এখন মানুষের বিশ্বাস হাতিয়ে নেওয়া যায়; সত্যিকারের প্রতিবাদ না করেও প্রতিবাদী হিসেবে পরিচিত হওয়া যায়; সমাজের কোনো সমস্যার সমাধান না করেও সমাজসেবকের ভাবমূর্তি গড়ে তোলা যায়। প্রয়োজন শুধু ক্যামেরার সামনে কয়েকটি থাপ্পড়, ক্যাপশনে একটু নৈতিকতা, আর দর্শকের আবেগকে উসকে দেওয়ার মতো অভিনয়। তারপর লাখ লাখ ভিউ, হাজার হাজার মন্তব্য, পরিচিতি এবং আয়। কে বলেছে দেশে কর্মসংস্থানের অভাব? অভিনীত চাঁদাবাজ আছে, অভিনীত ভুক্তভোগী আছে, অভিনীত প্রতিবাদী আছে; শুধু সত্যিকারের জবাবদিহি আর সত্যিকারের সচেতনতার চরিত্র দুটি যেন এখনো কাস্টিংয়ের অপেক্ষায়।
লেখক: রম্যরচয়িতা